জলপাইগুড়ির কাছাকাছি একটি ছোট্ট গ্রামে রহিম নামে এক যুবক থাকত। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল নিজের একটি বিস্কুট কারখানা হবে। অনেক কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়ে অবশেষে সে একটি ছোট কারখানা গড়ে তুলল। কারখানায় তার ছিল দুটি প্রধান সম্পদ—
• কিছু শ্রমিক
• কয়েকটি মেশিন
প্রথম দিন রহিম ৫ জন শ্রমিক এবং ২টি মেশিন নিয়ে কাজ শুরু করল। সারা দিন শেষে ১০০০ প্যাকেট বিস্কুট তৈরি হলো।
রহিম খুশি।
পরদিন সে ভাবল, "যদি আরও শ্রমিক নিই তাহলে কি উৎপাদন বাড়বে?"
সে আরও ৫ জন শ্রমিক নিল।
এবার ১০ জন শ্রমিক এবং একই ২টি মেশিন দিয়ে কাজ করল।
দিন শেষে দেখা গেল ১৬০০ প্যাকেট বিস্কুট তৈরি হয়েছে।
রহিম বুঝল, শ্রমিক বাড়লে উৎপাদনও বাড়ে।
কয়েকদিন পর সে আরও দুটি মেশিন কিনল।
এখন ১০ জন শ্রমিক এবং ৪টি মেশিন দিয়ে কাজ হলো।
দিন শেষে ২৮০০ প্যাকেট বিস্কুট তৈরি হলো।
এবার রহিম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝল—
তার কারখানার মোট উৎপাদন নির্ভর করছে শ্রমিক এবং মেশিন—এই দুইটির উপর।
যত এগুলোর পরিমাণ পরিবর্তিত হচ্ছে, তত উৎপাদনের পরিমাণও পরিবর্তিত হচ্ছে।
একদিন রহিম শহরে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় গেল।
সেখানে তাকে শেখানো হল—
কীভাবে মেশিন আরও দক্ষভাবে ব্যবহার করতে হয়,
কীভাবে কাঁচামাল নষ্ট না করে কাজ করতে হয়,
কীভাবে শ্রমিকদের কাজ ভাগ করে দিলে সময় বাঁচে।
প্রশিক্ষণ শেষে রহিম কারখানায় ফিরে এল।
অবাক ব্যাপার হল—
এবারও তার ১০ জন শ্রমিক।
এবারও তার ৪টি মেশিন।
কিন্তু উৎপাদন হলো ৩৫০০ প্যাকেট।
সবাই অবাক।
শ্রমিক বাড়েনি।
মেশিন বাড়েনি।
তাহলে উৎপাদন বাড়ল কীভাবে?
রহিম হেসে বলল,
"আমাদের কাজ করার পদ্ধতি বদলেছে।"
ধরো, একই চাল-ডাল দিয়ে একজন সাধারণ রাঁধুনি খিচুড়ি রান্না করল, আর একজন অভিজ্ঞ রাঁধুনি রান্না করল।
উপকরণ একই।
কিন্তু ফলাফল এক নয়।
কারণ দক্ষতা এক নয়।
কারখানাতেও ঠিক তাই।
শুধু শ্রমিক বা মেশিন থাকলেই হয় না, সেগুলো কত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
একদিন হঠাৎ কলকাতার একটি বড় কোম্পানি রহিমকে ১০,০০০ প্যাকেট বিস্কুটের অর্ডার দিল।
ডেলিভারি দিতে হবে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে। রহিম চিন্তায় পড়ে গেল। সে হিসাব করতে বসল।
রহিম ভাবল—
"আমি কি নতুন কারখানা বানাতে পারব?"
না।
"নতুন জমি কিনে কারখানা বাড়াতে পারব?"
না।
"বড় বড় নতুন মেশিন বসাতে পারব?"
না।
কারণ মাত্র ১৫ দিন সময়।
তাহলে সে কী করতে পারবে?
• আরও কিছু শ্রমিক নিয়োগ করতে পারবে।
• শ্রমিকদের ওভারটাইম করাতে পারবে।
• অতিরিক্ত শিফট চালাতে পারবে।
অর্থাৎ কিছু জিনিস পরিবর্তন করা সম্ভব, কিছু জিনিস পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এই সময়টাকে বলা যায় "সীমাবদ্ধ সময়"। এখানে কারখানার ভবন, বড় মেশিন ইত্যাদি স্থির রয়ে যায়, কিন্তু শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো যায়।
ধরো অর্ডার পাওয়ার পর রহিমের হাতে ৫ বছর সময় রয়েছে। এবার চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। এখন সে—
• নতুন জমি কিনতে পারবে।
• নতুন কারখানা বানাতে পারবে।
• আরও বড় মেশিন আনতে পারবে।
• নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।
• শ্রমিক বাড়াতে পারবে।
• উৎপাদন ব্যবস্থাই বদলে ফেলতে পারবে।
এবার আর কোনো উপকরণ স্থির নেই। সবকিছু পরিবর্তন করা সম্ভব।
একদিন রহিমের বন্ধু করিম তাকে জিজ্ঞেস করল,
"তুই বল তো, কারখানায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কী?"
রহিম একটু হেসে বলল,
"দুইটা জিনিস।"
করিম বলল,
"কী কী?"
রহিম বলল,
"প্রথমত, আমার কাছে কত শ্রমিক আর কত মেশিন আছে।"
"দ্বিতীয়ত, আমি সেগুলো কত বুদ্ধি করে ব্যবহার করছি।"
করিম আবার জিজ্ঞেস করল,
"আর সময়?"
রহিম বলল,
"সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।"
"যখন সময় কম থাকে, তখন সবকিছু বদলানো যায় না।"
"আর যখন অনেক সময় থাকে, তখন প্রায় সবকিছুই বদলে ফেলা যায়।"
রহিমের কারখানার গল্প আমাদের তিনটি বড় সত্য শেখায়—
প্রথমত, উৎপাদন নির্ভর করে বিভিন্ন উপকরণের উপর।
দ্বিতীয়ত, একই উপকরণ ব্যবহার করেও দক্ষতা ও প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে বেশি উৎপাদন করা যায়।
তৃতীয়ত, সময় যত বাড়ে, উৎপাদনের উপকরণ পরিবর্তনের সুযোগও তত বাড়ে।
আর এ কারণেই একজন সফল উদ্যোক্তা শুধু শ্রমিক ও মেশিন গোনে না; সে দেখে কীভাবে সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার হাতে কতটা সময় আছে। কারণ প্রকৃত উৎপাদনের রহস্য লুকিয়ে থাকে উপকরণ, প্রযুক্তি এবং সময়—এই তিন বন্ধুর মধ্যে।

0 Comments