নদিয়ার এক গ্রামে শ্যামল চক্রবর্তী নামে একজন কৃষক থাকতেন। গ্রামের সবাই তাকে "শ্যামল কাকা" বলে ডাকত। তার ছিল একটি সুন্দর আমবাগান। বাগানটি খুব বড় নয়, আবার খুব ছোটও নয়। বাগানে ছিল—
• নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি
• নির্দিষ্ট সংখ্যক আমগাছ
• একটি সেচ ব্যবস্থা
এগুলো সব আগেই স্থির ছিল।
এক গ্রীষ্মে শ্যামল কাকা ভাবলেন, "যদি আরও বেশি শ্রমিক কাজে লাগাই, তাহলে কি আমের উৎপাদন বাড়বে?"
তার ছেলে সৌরভ বলল, "চল বাবা, পরীক্ষা করে দেখি।"
রমেশ সারাদিন কাজ করে ১০ ঝুড়ি আম সংগ্রহ করল।
সৌরভ খাতায় লিখল—
১ জন শ্রমিক → ১০ ঝুড়ি আম
পরদিন আরেকজন শ্রমিক এল। সুরেশ।
এখন দুজনে মিলে ২৬ ঝুড়ি আম তুলল।
সৌরভ হিসাব করল।
আগে ছিল ১০। এখন হয়েছে ২৬।
নতুন শ্রমিক যোগ হওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে—
২৬ - ১০ = ১৬ ঝুড়ি।
সুরেশ একাই যেন অতিরিক্ত ১৬ ঝুড়ি আম এনে দিল।
মোট উৎপাদন হলো ৪২ ঝুড়ি।
নতুন শ্রমিক যোগ হওয়ার ফলে বৃদ্ধি—
৪২ - ২৬ = ১৬ ঝুড়ি।
মহেশও ১৬ ঝুড়ি বাড়তি উৎপাদন যোগ করল।
চতুর্থ দিন এবার ৪ জন শ্রমিক।
উৎপাদন হল ৫৬ ঝুড়ি।
বৃদ্ধি—
৫৬ - ৪২ = ১৪ ঝুড়ি।
পঞ্চম দিন আরকে শ্রমিক বাড়িয়ে ৫ জন শ্রমিক করা হল।
উৎপাদন হল ৭০ ঝুড়ি। বৃদ্ধি—
৭০ - ৫৬ = ১৪ ঝুড়ি।
প্রথমদিকে নতুন শ্রমিক এলে উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। কারণ সবাই একে অপরকে সাহায্য করছে।
কেউ গাছে উঠছে।
কেউ ঝুড়ি ধরছে।
কেউ বাছাই করছে।
কেউ ট্রলিতে তুলছে।
ফলে দলগত কাজের কারণে উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে।
সৌরভ বলল, "বাবা, একজন শ্রমিক গড়ে কত আম তুলছে?"
শ্যামল কাকা বললেন, "মোট উৎপাদনকে শ্রমিক সংখ্যা দিয়ে ভাগ কর।"
ধরো—
৪২ ঝুড়ি আম
৩ জন শ্রমিক
তাহলে, ৪২ ÷ ৩ = ১৪
অর্থাৎ প্রত্যেকে গড়ে ১৪ ঝুড়ি আম তুলছে।
এটাই গড় উৎপাদন (Average Product)।
"নতুন শ্রমিক যোগ হলে অতিরিক্ত কত উৎপাদন বাড়ে?"
শ্যামল কাকা বললেন,
"সেটাই প্রান্তিক উৎপাদন (Marginal Product)।"
যেমন—
২ থেকে ৩ জন শ্রমিক হওয়ায় উৎপাদন
২৬ → ৪২
বৃদ্ধি = ১৬
এই ১৬-ই তৃতীয় শ্রমিকের প্রান্তিক উৎপাদন (Marginal Product)।
"যত বেশি শ্রমিক, তত বেশি উৎপাদন।"
তাই তিনি শ্রমিক বাড়াতে লাগলেন।
৬ জন শ্রমিক। উৎপাদন হল ৭৮ ঝুড়ি। বৃদ্ধি মাত্র ৮।
৭ জন শ্রমিক। উৎপাদন হল ৮৪ ঝুড়ি। বৃদ্ধি মাত্র ৬।
৮ জন শ্রমিক। উৎপাদন হল ৮৮ ঝুড়ি। বৃদ্ধি মাত্র ৪।
৯ জন শ্রমিক। উৎপাদন হল ৯০ ঝুড়ি। বৃদ্ধি মাত্র ২।
"বাবা, আগে একজন নতুন শ্রমিক ১৬ ঝুড়ি বাড়াচ্ছিল। এখন মাত্র ২ ঝুড়ি কেন?"
শ্যামল কাকা বললেন, "কারণ বাগান তো একই আছে।"
জমি বাড়েনি।
গাছ বাড়েনি।
কিন্তু লোক বাড়ছে।
ফলে সবাই একে অপরের কাজে বাধা দিতে শুরু করেছে।
শ্যামল কাকা বললেন, ধরো, একটি ছোট রান্নাঘরে ২ জন রাঁধুনি কাজ করছে। সব ঠিক। এখন ১০ জন রাঁধুনি ঢুকিয়ে দিলে কী হবে? কেউ কারও সঙ্গে ধাক্কা খাবে। কেউ চুলার সামনে দাঁড়াবে। কেউ হাঁটতেই পারবে না। ঠিক একই ঘটনা আমবাগানেও হচ্ছে।
বৃদ্ধি = ০
অর্থাৎ দশম শ্রমিক কোনো অতিরিক্ত আমই তুলতে পারল না। সে এসেছে ঠিকই। কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি। অর্থাৎ প্রান্তিক উৎপাদন শূন্য।
শ্যামল কাকা আরও একজন শ্রমিক নিলেন। ১১ জন শ্রমিক। এবার অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল। মোট উৎপাদন কমে ৮৮ ঝুড়ি হয়ে গেল।
সৌরভ চিৎকার করে বলল,
"এটা কীভাবে সম্ভব!"
শ্যামল কাকা বললেন, "এবার শ্রমিক বেশি হয়ে গেছে।"
কেউ গাছের ডাল ভেঙে ফেলছে।
কেউ অন্যের কাজে বাধা দিচ্ছে।
কেউ ভুল করে ঝুড়ি ফেলে দিচ্ছে।
ফলে উৎপাদন বাড়ার বদলে কমে গেছে।
যদি একটি জিনিস স্থির থাকে (যেমন জমি) আর অন্য একটি জিনিস (যেমন শ্রমিক) ক্রমাগত বাড়ানো হয়, তাহলে তিনটি পর্যায় দেখা যায়। একেই পরিবর্তনশীল অনুপাতের নিয়মের রহস্য বলে।
# প্রথম পর্যায়: জাদুর সময়
শুরুতে উৎপাদন দ্রুত বাড়ে। কারণ সহযোগিতা বাড়ে। কাজের দক্ষতা বাড়ে। সবাই একে অপরকে সাহায্য করে।
# দ্বিতীয় পর্যায়: ধীর বৃদ্ধি
এরপর উৎপাদন বাড়ে ঠিকই, কিন্তু আগের তুলনায় ধীরে। কারণ স্থির উপকরণের অভাব অনুভূত হতে শুরু করে।
# তৃতীয় পর্যায়: বিপর্যয়
অবশেষে এমন অবস্থা আসে, যেখানে নতুন শ্রমিক যোগ করলেও উৎপাদন আর বাড়ে না। পরে কমতেও শুরু করে।
সেদিন রাতে সৌরভ বুঝল—
সাফল্য শুধু মানুষ বাড়ানোর মধ্যে নেই। যদি মাঠ একই থাকে, তাহলে অসীম সংখ্যক শ্রমিক এনে লাভ নেই। এক সময় তারা সম্পদ হয়ে ওঠে, আবার এক সময় বোঝা হয়ে যায়।
"প্রথম শ্রমিক উৎপাদন শুরু করে।"
"নতুন শ্রমিক উৎপাদন বাড়ায়।"
"অতিরিক্ত শ্রমিক উৎপাদনের গতি কমিয়ে দেয়।"
"আর খুব বেশি শ্রমিক উৎপাদন কমিয়েও দিতে পারে।"
তাই বুদ্ধিমান উদ্যোক্তা শুধু "কতজন লোক আছে" তা দেখে না। সে দেখে—
জমি, শ্রম, যন্ত্র এবং মানুষের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য আছে কি না।
কারণ প্রকৃত সাফল্য বেশি মানুষে নয়, সঠিক অনুপাতে মানুষ ব্যবহারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

0 Comments