Welcome to the Official Web Portal of Lakshyavedh Group of Firms

উৎপাদনের স্বল্পকাল এবং দীর্ঘকাল গল্পের মাধ্যমে "আমিনুলের বেকারি আর সময়ের জাদু"

জলপাইগুড়ি শহরের এক কোণে ছিল "স্বপ্ন বেকারি"। বেকারির মালিক ছিল আমিনুল। ছোট্ট দোকান, কয়েকজন কর্মচারী আর দুটি ওভেন নিয়েই তার ব্যবসা শুরু। প্রতিদিন সকালে দোকান খুলতেই গরম গরম কেক, পাউরুটি আর বিস্কুটের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।

একদিন তার ছেলে রিফাত জিজ্ঞেস করল,
— বাবা, তুমি কীভাবে বুঝো আজ কত কেক বানানো যাবে?

আমিনুল হেসে বলল,
— এটা একটা মজার হিসাব। চল, গল্প করে বুঝিয়ে বলি।
আমিনুল বলল, ধরো আমার কাছে আছে—
• ৫ জন কর্মচারী
• ২টি ওভেন

এই অবস্থায় আমি দিনে ৫০০টি কেক বানাতে পারি।

পরদিন যদি কর্মচারী বাড়িয়ে ১০ জন করি কিন্তু ওভেন একই রাখি, তাহলে হয়তো ৮০০টি কেক বানাতে পারব।

আবার যদি কর্মচারী ১০ জনই থাকে কিন্তু ওভেন বাড়িয়ে ৪টি করি, তাহলে হয়তো ১৫০০টি কেক তৈরি হবে।

রিফাত বলল,
— তাহলে কেকের সংখ্যা নির্ভর করছে কর্মচারী আর ওভেনের উপর?

— একদম ঠিক। আমিনুল বলল,
— কেক আকাশ থেকে আসে না। যত বেশি লোক কাজ করবে আর যত বেশি মেশিন থাকবে, তত বেশি কেক বানানো সম্ভব।
একদিন শহরে এক বিখ্যাত শেফ এলেন। তিনি আমিনুলের বেকারি দেখে বললেন,
— তোমার কর্মচারীরা অনেক পরিশ্রম করছে, কিন্তু কাজের পদ্ধতি পুরোনো। তিনি সবাইকে নতুন প্রশিক্ষণ দিলেন।
✓ কীভাবে দ্রুত ময়দা মাখতে হয়,
✓ কীভাবে কম সময়ে ওভেন ব্যবহার করতে হয়,
✓ কীভাবে অপচয় কমাতে হয়।

এক মাস পরে অবাক ঘটনা ঘটল। আগে—
১০ জন কর্মচারী + ৪টি ওভেন
= ১৫০০ কেক

এখনও—
১০ জন কর্মচারী + ৪টি ওভেন

কিন্তু উৎপাদন হলো ২০০০ কেক।

রিফাত অবাক।
— বাবা, কর্মচারীও বাড়েনি, ওভেনও বাড়েনি। তাহলে কেক বাড়ল কীভাবে?

আমিনুল বলল,
— কারণ আমরা বুদ্ধিমান হয়েছি।

একই উপকরণ ব্যবহার করেও যদি কাজের পদ্ধতি উন্নত হয়, তাহলে উৎপাদন বেড়ে যায়।
একদিন কলকাতার একটি বড় হোটেল ফোন করল।
— আগামী সাত দিনের মধ্যে আমাদের ২০,০০০ কেক চাই।

আমিনুল ঘাবড়ে গেল।

সময় মাত্র এক সপ্তাহ।

আমিনুল হিসাব করল।

সে কি এক সপ্তাহে নতুন কারখানা বানাতে পারবে?

না।

নতুন জমি কিনতে পারবে?

না।

নতুন বিশাল ওভেন আমদানি করতে পারবে?

না।

কিন্তু কিছু কাজ করতে পারবে।

• অতিরিক্ত কর্মচারী নিতে পারবে।
• রাতের শিফট চালু করতে পারবে।
• ওভারটাইম করাতে পারবে।

অর্থাৎ কিছু জিনিস পরিবর্তন করা সম্ভব, কিছু জিনিস সম্ভব নয়।
আমিনুল তার কর্মচারীদের নিয়ে মজা করে বলত—
"আমার কারখানায় দুই ধরনের বন্ধু আছে।"

প্রথম বন্ধু: স্থির বন্ধু
এরা হল—
• কারখানার ভবন
• বড় ওভেন
• জমি

এরা এক সপ্তাহে বদলায় না।

দ্বিতীয় বন্ধু: চলমান বন্ধু
এরা হল—
• কর্মচারী
• কাজের সময়
• কাঁচামালের পরিমাণ

এদের সহজে বাড়ানো বা কমানো যায়।
পাঁচ বছর কেটে গেল। এবার আমিনুলের ব্যবসা অনেক বড়। সে ভাবল,
"আমি এবার পুরো ব্যবসাটাই বদলে ফেলব।"

সে—
• নতুন জমি কিনল।
• নতুন ভবন তৈরি করল।
• ১০টি নতুন ওভেন আনল।
• রোবটিক মেশিন বসাল।
• কর্মচারীর সংখ্যা দ্বিগুণ করল।

এখন তার আগের ছোট্ট বেকারিকে কেউ চিনতেই পারে না।

রিফাত আবার জিজ্ঞেস করল,
— বাবা, একটা কথা বুঝতে পারছি না। এক সপ্তাহ আগে যেগুলো বদলানো যায়নি, পাঁচ বছর পরে সেগুলো বদলানো গেল কীভাবে?

আমিনুল বলল,
— কারণ সময়ই আসল জাদুকর।

যখন সময় কম থাকে, তখন অনেক জিনিস আটকে যায়। অর্থাৎ অল্প সময়ে কিছু জিনিস বদলানো যায়, সব নয়।

যখন সময় বেশি থাকে, তখন প্রায় সবকিছু বদলে ফেলা যায়।
এক সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার সময় আমিনুল রিফাতকে বলল—
"সফল ব্যবসার তিনটি গোপন বন্ধু আছে।"

রিফাত জিজ্ঞেস করল,
— কারা?

আমিনুল বলল,
প্রথম বন্ধু — উপকরণ।
দ্বিতীয় বন্ধু — দক্ষতা ও প্রযুক্তি।
তৃতীয় বন্ধু — সময়।

উপকরণ ছাড়া উৎপাদন হয় না।

দক্ষতা ছাড়া উপকরণের পূর্ণ ব্যবহার হয় না।

আর সময় ছাড়া বড় পরিবর্তন সম্ভব হয় না।

তারপর সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
"যে ব্যবসায়ী বুঝতে পারে কোন জিনিস আজই বদলানো যায় আর কোন জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সেই ব্যবসায়ীই একদিন ছোট দোকান থেকে বড় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।"

আর সেই দিন থেকেই রিফাত বুঝে গেল—
উৎপাদনের গল্প আসলে শুধু কারখানার গল্প নয়; এটা মানুষ, উপকরণ, প্রযুক্তি আর সময়ের বন্ধুত্বের গল্প।

Post a Comment

0 Comments